১৯শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং | ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১২:৪৫

কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক?

সুদর্শন নিমাই দাস: যার জন্ম হয়েছে, তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। আর মানুষের মৃত্যুর পর স্বর্গে অথবা বা নরকে গমনের বিষয়টি প্রতিটি ধর্মেই রয়েছে। এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে বৈদিক শাস্ত্রে। তথাপি আজ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জালে আবদ্ধ মানুষের কাছ থেকে আড়াল হতে চলেছে স্বর্গ-নরকের ধারণা। অনেকের কাছে স্বর্গ-নরক বলে কিছু নেই। আর স্বর্গ-নরকের ঊর্ধ্বে যে কিছু আছে, তা তো সাধারণ মানুষের চিন্তারই অতীত। আবার, কারো ধারণা মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক। কেউ কি আদৌ স্বর্গ-নরক দেখেছে? যদি স্বর্গ-নরক থেকেই থাকে, তবে আমরা তা দেখি না কেন? এভাবে, কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরকÑ অনেকেরই অজানা। এ অজানাকে জানতে এ প্রবন্ধে স্বর্গ-নরক সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
স্বর্গ-নরকের অবস্থান কোথায়?
আমরা যে মহাবিশ্ব দেখছি তা কেবল একটি ব্রহ্মা-ের অভ্যন্তরীণ দৃশ্য। মাটি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ ও মন, বুদ্ধি, অহংকারÑ এ আটটি উপাদানের আবরণে সৃষ্ট একটি ব্রহ্মান্ড। এর বাইরে কারণ সমুদ্রে শায়িত আছেন পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের স্বাংশ প্রকাশ কারণোদকশায়ী বিষ্ণু, যার লোমকূপ থেকে অনন্ত কোটি ব্রহ্মা- প্রকাশিত হচ্ছে এবং প্রতিটি ব্রহ্মান্ডে তিনিই আবার গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুরূপে প্রবিষ্ট হন। তার শরীরের স্বেদজল (ঘাম) দ্বারা ব্রহ্মা-ের অর্ধভাগ পূর্ণ হয়; যাকে বলা হয় গর্ভোদক সমুদ্র এবং সেই জলে অনন্তশয্যায় তিনি শয়ন করেন। শ্রীমদ্ভাগবতে (৩.১০.৮) বলা হয়েছে, ব্রহ্মা-ের অভ্যন্তরস্থ গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুর নাভিপদ্মজাত ব্রহ্মা ব্রহ্মা-ের (এই ব্রহ্মা-ের ব্যাস: ৪০০ কোটি মাইল) উপরের অর্ধাংশকে প্রথমে ঊর্ধ্বলোক, মধ্যলোক (ভূলোক) এবং অধঃলোকÑ তিনটি স্তরে, তারপর চৌদ্দটি স্তরে ভাগ করেন; যাকে বলা হয় চতুর্দশ ভুবনÑদ্বিসপ্তধা। উল্লেখ্য যে, একটি স্তরে এক বা একাধিক গ্রহলোক বিদ্যমান। এই চতুর্দশ ভুবনের মধ্যে পৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃথিবীসহ উপরে রয়েছে সাতটি লোকÑ ভূ, ভূব, স্বর্গ, মহ, জন, তপ ও সত্য বা ব্রহ্মলোক এবং পৃথিবীর নিচে রয়েছে সাতটি লোকÑ অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও পাতাল। অর্থাৎ, পৃথিবীর অবস্থান স্বর্গ ও নরক গ্রহলোকের মাঝামাঝি। তাই, এখানে স্বর্গ ও নরক উভয় গ্রহলোকের প্রভাবই বিদ্যমান এবং কলিপূর্ব যুগত্রয়ে দৈব ও আসুরিক গুণ পৃথকভাবে পৃথক ব্যক্তির মধ্যে অবস্থান করলেও, বিশেষত এই কলিযুগে একই মানুষের মধ্যে দৈব ও আসুরিক গুণ বিদ্যমান। সে সূত্রে, মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক Ñ একথা বললেও, ভ্রান্তিবশত স্বর্গ-নরককে মানুষের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখা শাস্ত্রবিরুদ্ধ। কেননা, শাস্ত্রে স্বর্গ-নরকের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে।
নরকের অবস্থান সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভাগবতের ৫ম স্কন্ধে (৫.২৬.৫) বলা হয়েছেÑ সমস্ত নরক ত্রিলোকের অন্তরালে অবস্থিত। দক্ষিণদিকে ভূম-লের অধঃভাগে এবং গর্ভোদক সমুদ্রের উপরিভাগে নরক গ্রহের অবস্থান। এ প্রসঙ্গে শ্রীল প্রভুপাদ বলেন, ‘পাতাল লোকের নিচে নরক; আর ব্রহ্মা-ের তলদেশে গর্ভোদক সমুদ্র। তাই নরক গ্রহের অবস্থানটি হচ্ছে পাতাললোক ও গর্ভোদক সমুদ্রের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত।’
পাপাচারী মানুষ যখন স্থূল দেহ ত্যাগ করে, তখন যমদূতেরা তার সূক্ষ্ম দেহকে পাশবদ্ধ করে যমপুরীতে নিয়ে যায়। পৃথিবী থেকে যমপুরী অর্থাৎ নরক গ্রহের দূরত্ব ৮৬ হাজার যোজন বা ৭ লক্ষ ৯২ হাজার মাইল। অর্থাৎ ১১ লক্ষ ৮৮ হাজার কিলোমিটার। মহাভারতে বলা হয়েছে, ষড়শীতি-সহ¯্রযোজন-বিস্তীর্ণ-মার্গ। মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অতি দ্রুতগতি যমদূতেরা পাপাত্মাকে সেই স্থানে নিয়ে যায়। নরকের যম পুরীর নাম হচ্ছে সংযমনী। শ্রীসূর্যদেবের পুত্র ধর্মরাজ যম নরকের অধিপতি।
আমরা স্বর্গ-নরক দেখি না কেন?
মানুষ তার পাপ ও পুণ্য কর্মের কিছু ফল ভোগ করে নরকে বা স্বর্গে, আর কিছু কর্মের ফল এ পৃথিবীতেই ভোগ করে; তাই এখানে কেউ কখনো সুখী, কখনো দুঃখী। সাধারণ মানুষ কেবল এ পৃথিবীর সুখ-দুঃখই দেখতে পায়। তাই তারা স্বর্গ-নরকের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে চায়।
স্বর্গ-নরক দেখা যায় মৃত্যুর পর। কিন্তু আজকালকার মানুষ জীবিত থেকেই স্বর্গ-নরক দেখতে চায়। তা কী করে হয়? আগে তো মৃত্যুবরণ করুন! তবে, এ অধঃপতিত কলিযুগের পূর্বে জীবিত অবস্থাতেই কেউ কেউ স্বর্গ অথবা নরকে গিয়েছেন বলে শাস্ত্রে উল্লেখ আছে। কিন্তু যারা তাদের মতো জীবিত অবস্থাতেই স্বর্গ-নরক দর্শন করতে চান, তারা কি তাদের তুলনায় নিজের অবস্থান (যোগ্যতা) কখনো বিচার করেছেন? বোধ হয় করেননি।
যদি বলি হ্যাঁ, অনেকেই স্বর্গ-নরক দেখেছেন, এ কথা অনেকেই স্বীকার করবেন না। অথচ, এমন অনেক কিছুই আছে যার অস্তিত্ব তারা না দেখেই স্বীকার করছেন। পরমাণু কেউ কোনোদিন দেখেননি, তবু তা স্বীকার করছেন; কারো ময়লা হাতে যে ব্যাক্টেরিয়া থাকে, অনেকেই তা না দেখেই স্বীকার করছে। কিন্তু ধর্মীয় ব্যাপারেÑ ‘আমাকে দেখাতে পারবে?’ অথচ দেখার যোগ্যতা নেই। অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া যদি আমি বলি, ‘আমাকে ব্যাক্টেরিয়া দেখাতে পারবেন?’ তা কি সম্ভব?
ব্রহ্মা-ে অসংখ্য গ্রহলোক আছে, যেগুলো আমরা কেউই দেখতে পাই না। কারণ, সেগুলো অনেক দূরবর্তী হওয়ায় আমাদের দৃষ্টিসীমার অতীত। তেমনি স্বর্গ-নরকও সুদূরবর্তী। তাছাড়া, পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষই তার পূর্বজীবনের স্মৃতি মনে রাখতে পারেন না। তাই পূর্বজীবনে কেউ স্বর্গে অথবা নরকে থাকলেও তা তার বিস্মৃত। আবার, এ জীবনে যেহেতু এখনো মৃত্যুবরণ করেননি, তাই স্বর্গ-নরক দেখেননি। তাইÑ যা দেখিনা দুই নয়নে, বিশ্বাস করি না গুরুর বচনেÑএরূপ মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিরাই স্বর্গ-[জঞঋ নড়ড়শসধৎশ ংঃধৎঃ: }থএড়ইধপশ[জঞঋ নড়ড়শসধৎশ বহফ: }থএড়ইধপশনরক, পরকাল, আত্মা বা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, যদিও তারা অদেখা অনেককিছুই বিশ্বাস করে; যেমন, পরমাণু, ভাইরাস, মন ইত্যাদি। এদের বলা হয় নাস্তিক। তবে, তাদের হতাশ হবার কিছু নেই; কেননা, মৃত্যুর পর অচিরেই নরকের দর্শন পাবেন। একইভাবে, পুণ্যাত্মারাও মৃত্যুর পরই স্বর্গের দর্শন পাবেন।
স্বর্গ-নরকের ঊর্ধ্বে কী কিছু আছে?
ধরুন, দেশের বাইরে আপনি অত্যাধুনিক একটি ফাইভস্টার হোটেলে গেলেন। যতদিন আপনার হাতে অর্থ আছে, ততদিন আপনি সেখানে থাকতে পারবেন। কিন্তু, ক্রেডিট কার্ড ফুরিয়ে যাবার পরও যদি কেউ সেখানে থাকতে চায়, তবে তাকে অর্ধচন্দ্র (গলাধাক্কা) দিয়ে সেখান থেকে বের করে দেয়া হবে। একইভাবে, পৃথিবীতে পুণ্য কর্মের ফলে মানুষ ব্রহ্মা-ের স্বর্গাদি উচ্চতর লোকগুলোতে প্রবিষ্ট হয়। কিন্তু পুণ্য ক্ষয় হলে পুনরায় পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে। তাই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (৯/২১) ভগবান বলেছেনÑ ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোক বিষন্তি…। শুধু স্বর্গই নয়, ব্রহ্মা-ের অভ্যন্তরস্থ প্রতিটি লোকই পুনরাবর্তনশীলÑ আব্রহ্মভুবনাল্লোকা পুনরাবর্তিন… (ভ.গী.৮/১৬)। অথচ, জীবনের উচ্চতর গন্তব্য সম্বন্ধে জগতের অধিকাংশ লোকের ধারণা এ ব্রহ্মা-ের চৌদ্দ ভুবনের অন্তর্গত স্বর্গলোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তারা ভাবে, স্বর্গে গেলেই বুঝি সব পেয়ে গেল। ব্রহ্মা-ের আবরণের বাইরে চিন্ময় জগৎ সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারণাই নেই, যেখানে অবস্থান করেন সমস্ত জগতের মালিক পরমেশ্বর ভগবান। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে, এ নিকৃষ্টা প্রকৃতির ঊর্ধ্বে আরো একটি উৎকৃষ্টা প্রকৃতি রয়েছে, সেটিই তার পরম ধাম। সেখানে একবার কেউ গেলে, তাকে আর পুনরায় এ দুঃখময় জগতে ফিরে আসতে হয় নাÑ মামুপেত্য তু কৌন্তেয় পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে। (ভ.গী.৮/১৬)
সুতরাং, প্রথমে মৃত্যুবরণ করুন অথবা তপস্যা ও কর্মের দ্বারা যোগ্যতা অর্জন করুন, তখন শুধু স্বর্গ-নরক নয়, ভগবানকেও দেখতে পারবেন। এ কলিযুগে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ধামে যাওয়ার একমাত্র পন্থা হচ্ছে “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ॥”Ñ এ মহামন্ত্র জপ ও কীর্তন করা। তাই, শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী আমাদের সাবধান করে দিয়ে বলেছেনÑ কৃষ্ণনাম ভজ জীব, আর সব মিছে। পালাইতে পথ নাই যম আছে পিছে ॥

প্রকাশ :  আগস্ট ৮, ২০১৮ ১:৪৪ অপরাহ্ণ
x

Check Also

মা সন্তানের বিয়ে দেখলে নেগেটিভ এনার্জি ছড়ায়! প্রচলিত যেসব রীতি নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন

স্টাফ রিপোর্টার: দেশের বিভিন্ন জায়গায় আচার-অনুষ্ঠানের অনেক রীতি রয়েছে। প্রত্যেক রীতির পিছনেই কোনও না কোনও ...