১৯শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং | ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১২:৪০

লাখো মানুষ পানিবন্দি

স্টাফ রিপোর্টার : ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নামা ঢল অব্যাহত থাকায় দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। দেশের নদ-নদীগুলোর পানি ক্রমেই বাড়ছে। পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় নতুন নতুন এলাকাও প্লাবিত হচ্ছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টা হতে পারে মাঝারি থেকে প্রবল বর্ষণ। আর তাতে বাড়বে পানির প্রবাহ। সঙ্গে রয়েছে পাশ্ববর্তী ভারত ও নেপালের ভারী বৃষ্টির প্রভাব। চীনের মোহনা থেকে বয়ে আসা বহ্মপুত্রের ঢলের প্রভাব, আসামের ঢল একই সঙ্গে চোখ রাঙ্গাচ্ছে।

শনিবারের পূর্বাভাস বলছে, চলতি সপ্তাহ জুড়ে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হবে। একই সঙ্গে বন্যা মধ্যাঞ্চলেও (ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল) ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। শনিবারের তথ্য অনুযায়ী, সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, ধলাই, খোয়াই, সোমেশ্বরী, কংস, হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, ধরলা, তিস্তা, ঘাঘট, বহ্মপুত্র, যমুনা সহ ১৫ নদীর পানি ২৩ পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সাঙ্গু নদীর পানি বান্দরবানে ১২১ সেন্টিমিটার ও দোহাজারীতে বিপদসীমার ১০৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

আগামী ২৪ ঘণ্টায় নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলেও জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূইয়া এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আগামী ৩/৪ দিন পানি ভালোই বাড়বে, উত্তরবঙ্গ থেকে বন্যাটা আস্তে আস্তে মধ্যাঞ্চলের দিকে আসবে। বন্যা যমুনা হয়ে পদ্মাতে আসবে। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর পানি বাড়তে পারে বলে মনে করছি, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর পানি কোনো কোনো পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতেও পারে। আর এই পরিস্থিতি আরো দশদিন অব্যাহত থাকবে। আগামী বুধ বা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হতে থাকবে জানিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘এরপর থেকে পানি কমতে শুরু করতে পারে। এরপরই বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাবে।’ নতুন করে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর অঞ্চলে বন্যা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেও জানান আরিফুজ্জামান।

প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদ : লালমনিরহাট থেকে লাভলু শেখ জানান, জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তিস্তা, ধরলার পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। শুক্রবার সকাল ৯ টায় ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও গতকাল শনিবার তা বেড়ে বিপদসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জেলার ৫ উপজেলার ২০টি ইউনিয়নের অন্তত ৪০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জলমগ্ন হয়েছে নতুন নতুন এলাকা, পানি ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। ফলে দুর্ভোগে পড়েছে নি¤œ আয়ের মানুষজন। পানি ঢুকে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, গড্ডিমারী, বড়খাতা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এ ছাড়াও রেড এলার্ট জারি করে মাইকিং করা হচ্ছে।

নীলফামারী থেকে সোহেল রানা জানান, জেলার তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল শনিবার সকালে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। বিশেষ করে সবচেয়ে হুমকির মুখে পড়েছে বাঁধগুলো। পানি বৃদ্ধি পেয়ে ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গয়াবাড়ি ও জলঢাকা উপজেলারগোলমুন্ডা ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি গ্রামের প্রায় ২৫ সহ¯্রাধিক পরিবার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রেখে রাখা হয়েছে। সকল কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম থেকে শাহনাজ পারভিন জানান, জেলার নদনদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। প্লাবিত হয়ে পড়ছে চর-দ্বীপচরসহ নদনদী তীরবর্তী নতুন নতুন এলাকা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে কাঁচাপাকা সড়ক তলিয়ে থাকায় ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। গতকাল শনিবার সেতু পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ৫২ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো।

সিরাজগঞ্জ থেকে সোহাগ হাসান জানান, জেলার যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি ৪২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালি, কাজিপুর ও শাহজাদপুর উপজেলার যমুনা চরাঞ্চলে পানি বৃদ্ধির কারনে নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার পুঠিয়াবাড়ি ও চরমালশাপাড়া এলাকায় বাঁধের নিচে বসবাসরত ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। এসব মানুষ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নবীগঞ্জ উপজেলায় কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ৪২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধ উপচে বেশ কয়েকটি গ্রামে প্রবেশ করছে পানি। হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় নবীগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ৪২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হবিগঞ্জ জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম বলেন, গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় কুশিয়ারা নদীর পানি বর্তমানে বিপদসীমার ৪২ সে.মি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো।

সিলেট থেকে আশরাফ রাজু জানান, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে সিলেটের সবকটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে নতুন করে জনপদ তলিয়ে গেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, পিয়াইন ও সারী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন এলাকায় ঢুকে পড়েছে। তলিয়ে গেছে উপজেলার সবকটি হাওর। এদিকে, সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জকিগঞ্জ ও ওসমানীনগরে নদীভাঙনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সুনামগঞ্জ থেকে সুহেল আলম জানান- জেলা সদর থেকে বিশ্বম্ভরপুর-তাহিরপুরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, গতকাল শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সুরমা নদীর পানির বিপদসীমার ৮৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

জামালপুর থেকে শরিফুল ইসলাম জানান, যমুনার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে। পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির তোড়ে ইসলামপুরের পূর্ববামনা ও উলিয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ সড়ক বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। জেলার ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ি উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের কমপক্ষে ৪০টি গ্রাম বন্যার পানি প্রবেশ করেছে।

প্রকাশ :  জুলাই ১৪, ২০১৯ ৬:১৫ অপরাহ্ণ
x

Check Also

বস্তিবাসীদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে : প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বস্তিবাসীরা নাজুকভাবে থাকলেও তাদের ভাড়া কিন্তু কোনো অংশে ...