প্রকল্প বন্ধ ছয় বছর, পাহারায় দুই বৃদ্ধ: তিন বছর ধরে মিলছে না বেতন
গোপালগঞ্জের পল্লী জনপদ প্রকল্পে পড়ে আছে সরকারি সম্পদ; পাওনা দাবি প্রায় ১০ লাখ টাকা
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি,
নির্মাণকাজ বন্ধ হয়েছে প্রায় ছয় বছর। নেই কোনো কর্মচাঞ্চল্য, নেই নতুন নির্মাণের কার্যক্রম। প্রকল্প এলাকার বিভিন্ন স্থানে পড়ে আছে নির্মাণসামগ্রী ও সরকারি সরঞ্জাম। অথচ বন্ধ প্রকল্পের সম্পদ পাহারায় এখনো দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন গোপালগঞ্জের দুই প্রবীণ কর্মী। অভিযোগ, এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গত তিন বছর ধরে তারা কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার হরিদাসপুর ইউনিয়নের ভেড়ারবাজার এলাকায় ‘পল্লী জনপদ, গোপালগঞ্জ’ গৃহায়ন প্রকল্পে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পটির কাজ বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)-এর তত্ত্বাবধানে শুরু হলেও পরবর্তীতে সরকারি সিদ্ধান্তে এর কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।
প্রকল্প এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী দুই কর্মী হলেন ৬৫ বছর বয়সী মো. বিশু মাতুব্বর ও ৬৬ বছর বয়সী জালু শেখ। তাদের দাবি, প্রায় তিন বছর ধরে তারা নিয়মিত প্রকল্প এলাকায় অবস্থান করছেন এবং সরকারি সম্পদ পাহারা দিচ্ছেন। কিন্তু এ সময়ে তাদের কোনো বেতন পরিশোধ করা হয়নি।
দুই কর্মীর হিসাব অনুযায়ী, বেতন-ভাতা বাবদ তাদের মোট পাওনা প্রায় ১০ লাখ টাকারও বেশি। দীর্ঘদিন আয় না থাকায় তাদের সংসারে দেখা দিয়েছে তীব্র আর্থিক সংকট।
বিশু মাতুব্বর ও জালু শেখ জানান, প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও এলাকায় থাকা বিভিন্ন মালামাল ও সরঞ্জাম রক্ষার জন্য তাদের সেখানে থাকতে হচ্ছে। দায়িত্ব ছেড়ে চলে গেলে সরকারি সম্পদ চুরি বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বেতন না পেলেও তারা এতদিন দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তাদের অভিযোগ, প্রকল্প এলাকায় অতীতে কয়েক দফা মালামাল চুরির ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় মামলা-মোকদ্দমার খরচ চালাতেও তাদের নিজেদের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। কখনো নিজেদের জমানো টাকা, আবার কখনো ধারদেনা করে তারা এসব খরচ বহন করেছেন বলে জানান।
বিশু মাতুব্বর বলেন, ‘বেতন না পেলেও সরকারি মালামালের দায়িত্ব ছেড়ে যেতে পারিনি। এতদিন কাজ করেছি। এখন অন্তত আমাদের পাওনাটুকু দেওয়া হোক। বয়স হয়েছে, নতুন করে কাজ পাওয়ারও সুযোগ নেই।’
জালু শেখও একই ধরনের দাবি জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন কাজ করার পর বেতন না পাওয়ায় পরিবার নিয়ে তিনি চরম কষ্টে রয়েছেন। বয়সের কারণে শারীরিকভাবে কঠিন কাজ করাও এখন তার পক্ষে সম্ভব নয়।
নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
দুই কর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারি সাপ্লায়ার প্রতিষ্ঠান ‘কোয়ান্টাম’-এর মালিক রফিকুল ইসলাম তাদের নিয়োগ দিয়েছিলেন। বকেয়া বেতন-ভাতা পাওয়ার বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তারা কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাননি বলে অভিযোগ করেন।
বিষয়টি নিয়ে রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় সরকারি সম্পদের বর্তমান অবস্থা এবং সেগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা দুই প্রবীণ কর্মীর বেতন-ভাতা পরিশোধ না হওয়ার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
দুই কর্মীর দাবি, তারা আর কোনো অতিরিক্ত সুবিধা চান না। দীর্ঘদিনের শ্রমের বিনিময়ে যে বেতন-ভাতা তাদের পাওনা, সেটুকু বুঝিয়ে দিলেই তারা সন্তুষ্ট। এরপর তাদের দায়িত্বে রাখা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষ নিলেও তাদের আপত্তি নেই।
স্থানীয়দের মতে, একদিকে বন্ধ প্রকল্পের সরকারি সম্পদ সংরক্ষণ, অন্যদিকে দুই প্রবীণ কর্মীর দীর্ঘদিনের বকেয়া—দুই বিষয়ই দ্রুত সমাধানের দাবি রাখে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও কর্মীদের পাওনা নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি
১৭ আগস্ট ২০২৬




